Thursday, March 24, 2016

My memoirs - Passed Higher Secondary

ইলেভেন-টুয়েল্ভের শিক্ষা মানুষের জীবনের ভিত্তি। একটি ছেলে বাকি জীবনে কি করবে, কোন লাইনে তার ন্যাক, কোন লাইনে যাবে, সেটা ওই দুই বছরে, ঠিক হয়ে যায়। আমার কিন্তু ওই দুই বছরের অভিজ্ঞতা সাংঘাতিক ও মর্মান্তিক। মাধ্যমিকের রেজাল্ট মোটামুটি ভালো হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র কোন কলেজ কিরকম এই বিষয়ে অনভিজ্ঞতার কারণে হায়ার সেকেন্ডারিতে ভর্তি হয়েছিলাম আমহার্স্ট স্ট্রিটের সেন্ট পল্স কলেজে। জানা ছিল না যে এটি একটি জঘন্যতম কলেজ। দুবছরে মোট দু মাসও ক্লাস হয়নি। ইলেভেন-টুয়েলভের আমরা ছিলাম সেকেন্ড ব্যাচ। কলেজের মাস্টাররা আমাদের চরম নেগলেক্ট করতেন। ক্লাসই নিতেন না। গরমের ও পুজোর ছুটি মাসের পর মাস। নানারকম পরীক্ষার সিট পড়ার জন্য ছুটি। এছাড়া ছিল ছাত্র পরিষদ আর এস এফ আইয়ের মারপিট। প্রিন্সিপাল সি বি সাউ কে একদিন তো ছাত্র পরিষদের ছেলেরা ডান্ডা মেরে মাথা ফাটিয়ে দিল। কলেজ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ রইল। ১৯৭৮ সালের বন্যাতেও ছুটি ছিল একমাসের ওপর। ক্লাস ইলেভেনে additional subject নিয়েছিলাম Advanced Physics ও Advanced Mathematics। গোটা এক বছর দুটো সাবজেক্টের কোনটারই একটাও ক্লাস হলনা বলে টুয়েলভে উঠে বায়োলজি additional subject নিলাম। যদিও এটা ছিল আমার অপছন্দের সাবজেক্ট। ওই additional সাবজেক্টের নম্বর টোটালে যোগ হত না, কিন্তু বায়োলজি না থাকলে আবার মেডিকাল জয়েন্টে বসা যাবে না। যাই হোক, কলেজে রোজই যেতাম ও ক্লাস হত না বলে কলেজ স্ট্রিটে চলে যেতাম। বাংলা সাহিত্যের পীঠস্থান কফি হাউসে তখন ইনফিউশন অর্থাত কালো কফি পাওয়া যেত ৬০ পয়সায়। ওটা দামেও সস্তা আর আঁতেল হবার ট্রেডমার্ক ছিল। কলেজে পড়ানো হত ইংরাজি মাধ্যমে, কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারির ইংরাজি মাধ্যমের বই তখনও বেরোতে শুরু করে নি, তাই ইন্টারমিডিয়েটের বইগুলোই ছিল আমাদের ভরসা। এই দুবছর প্রচুর পুরনো বইয়ের দোকান ঘুরেছি, বই কিনেছি। আলবার্ট কামুর আউটসাইডার, লোনির ট্রিগনোমেট্রি, লাডলীমোহনের কেমিস্ট্রি, যা পেয়েছি। এছাড়া বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরি ও শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের ভারতী পরিষদের মেম্বার ছিলাম। ইংরেজি পেপারব্যাক পড়ার সেই শুরু। ইয়ান ফ্লেমিং, জেমস হেডলি চেজ, মারিও পুজো, শার্লক হোমস, আগাথা ক্রিস্টি, কিছুই বাদ দিই নি। তখনকার দিনে মেয়েরা শাড়িই পরত। স্কার্ট ব্লাউজ তো দূর সালোয়ার কামিজই চালু হয়নি। কলেজ কম্পাউন্ডের মধ্যে প্রিন্সিপ্যালের কোয়ার্টারের বারান্দায় মাঝে মাঝে আমাদের এংলো ইন্ডিয়ান প্রিন্সিপ্যালের স্কার্ট ব্লাউজ পরিহিত মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। দুধে আলকাতরা প্রিন্সিপ্যালের অমন দুধে আলতা মেয়ে কি করে হল, এটাই ছিল গবেষনার বিষয়। জয়েন্ট এনট্রান্স ইত্যাদি সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা ছিল না। হুজুগে পড়ে কলেজের বন্ধুদের সাথে একদিন শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে যাদবপুর থেকে জয়েন্টের ফর্ম কিনে নিয়ে এলাম। যথারীতি ট্রেনের টিকিট কাটিনি। কারণ সেটা তখন ডিসক্রেডিটের ব্যাপার ছিল। সেই সময় জয়েন্টে দরখাস্ত দেওয়া ছাড়াও যাদবপুর, শিবপুর, দুর্গাপুর, জলপাইগুড়িতে আলাদা ভাবে দরখাস্ত করতে হত। যাদবপুরে ২০ টাকা জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু শিবপুরের জন্য রিজার্ভ ব্যাংকে ৬ টাকার চালান করার দরকার ছিল। রিজার্ভ ব্যাংকে গিয়েও ছিলাম। কিন্তু চালান বানানোর ব্যাপারটা না বুঝতে পেরে এসক্যালেটরে কয়েকবার ওঠানামা করে চলে এসেছিলাম। ভূভারতে তখন কোথাও এসক্যালেটর ছিল না। অর্থাৎ ফাইনালি আমি যাদবপুর ছাড়া আর কোথাও দরখাস্তই করিনি। এটা আমার বাহাদুরি নয়, অজ্ঞতা। আর জয়েন্ট ইত্যাদি নিয়ে আমাদের বাবা-মা-রাও কখনো মাথা ঘামাতেন না। ভবিষ্যতে কিছু একটা হয়ে যাবে, এই ছিল তাঁদের রিয়ালিস্টিক ভাবনাচিন্তা। তা যাই হোক, প্রথম বেরোলো আই আই টি-র রেজাল্ট। ১৫০০-র ওপরে rank ছিল। বাবার সঙ্গে খড়্গপুর গিয়ে মেডিক্যাল দিয়ে এলাম। সপ্তর্ষি মন্ডল বলে একটি ছেলে আমাদের সঙ্গেই মেডিক্যাল দিয়েছিল। নামটা অদ্ভুত বলে আজও মনে আছে। তারপর আই আই টি-র নেহেরু হলে (হোস্টেল) admission, সারারাত ragging, চুল কাটতে যাবার ছুতোয় হোস্টেল থেকে কলকাতা পলায়ন, ইত্যাদি অন্য গল্প। পালিয়ে তো এলাম, তখনও ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোয় নি। একদিন রেজাল্ট বেরিয়েছে শুনে হাওড়া থেকে বাস পাল্টে শিবপুর গেলাম। ২০০০ জনের নাম টাঙ্গিয়েছে। প্রচুর ভিড়। খোঁজাখুজি করে নাম নেই ধরে নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। দুচার দিন পর আমার বন্ধু সুব্রত সেনগুপ্ত ওরফে মুজিবর এসে খবর দিল, যে ও যাদবপুরে লিস্ট দেখতে গিয়েছিল। সেখানে নোটিস বোর্ডের সামনে প্রচন্ড ভিড়। কেউ একজন চেঁচিয়ে নাম পড়ে দিচ্ছিল। সেখানে আমার নাম ডেকেছিল। পরদিন যাদবপুরে গেলাম। বোর্ডে নাম রয়েছে। Rank চারশোর ওপরে এবং তিনশো পর্যন্ত ইন্টারভিউ হয়ে গেছে। পড়িমরি করে ফর্ম জমা দিয়ে সিভিল পেলাম। আগের rank- এর ছেলেরা ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইত্যাদি পেয়েছিল। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে মেডিক্যাল জয়েন্টের সবার নম্বর টাঙিয়ে দিয়েছিল। আমি পেয়েছিলাম ৫০০ তে ১৫০। তাতেও পরে মেডিক্যালের চিঠিও এসেছিল। কিন্তু তখন যাদবপুরে ভর্তি হয়ে গেছি। বন্ধুবান্ধব হয়ে গেছে। অন্য কিছু মাথাতেও আসেনি। গান্ধী ভবনে ওরিয়েন্টেশন, হলুদ ফাইল, হলুদ ফাইল হাতে থাকলে ragging এইসব হল। তারপর যাদবপুরে কাটিয়ে দিলাম চার বছর। বাকী জীবনে যেটুকু করে খাচ্ছি, সে ওই যাদবপুরে যা শিখেছি সেটা ভাঙ্গিয়েই চলছে।

No comments: