অনেকদিন আগেকার কথা। রাজারহাটে উপনগরী তৈরী হচ্ছে। প্রথম ধাপ হিসেবে ভেড়ির মাটি কেটে জমি ভরাট আর রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। প্রধান রাস্তাটি এখন সকলেই চেনেন, ১০ (৬+৪) লেনের এম.এ.আর বা মেজর অর্টেরিয়াল রোড। এটির কাজ প্রথম শুরু হয়। রাস্তাটি সেক্টর ফাইভের লাগোয়া কেষ্টপুর ক্যানাল এন.বি.সি.সি ব্রিজ দিয়ে পার করে শুরু হয়েছে এবং থার্ড রোটারি ও সিক্সথ রোটারিতে দুটি লেফট টার্ন নিয়ে শেষ হয়েছে ভি আই পি রোডের ওপর হলদিরামের উল্টো দিকে একটি রাইট টার্নিং ফ্লাইওভারে। কিন্তু প্রোজেক্ট এরিয়া রাজারহাট রোড পর্যন্ত। এই রাস্তাটির কাজও খুব নির্বিঘ্নে হয়নি। অ্যাকশন এরিয়া টু-তে, বাগজোলা ক্যানেল পেরিয়ে রাস্তার এলাইনমেন্টে একটি কবরস্থান ছিল। ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে কবরগুলি রিলোকেট করে রাস্তার এই অংশের কাজটি একরাতে কমপ্লিট করা হয়েছিল। নিউ টাউনে মূল এম.এ.আর ছাড়াও আরো অনেকগুলি এম.এ.আর আছে, যেমন ইস্ট-ওয়েস্ট এম.এ.আর, নর্থ-সাউথ এম.এ.আর, সাদার্ণ ও নর্দার্ণ এম.এ.আর, ইত্যাদি। নর্থ-সাউথ এম.এ.আরের কাজ শুরু হবার পর জমি নিয়ে সমস্যা শুরু হল। নর্থ-সাউথ এম.এ.আর রাজারহাটের কদমপুকুর মৌজায়। এটি সিক্সথ রোটারি থেকে পশ্চিম দিকে বেরিয়ে বাগজোলা খালের উত্তরে যেখানে এখন ইকোস্পেস হয়েছে, সেই জায়গাটিকে কানেক্ট করেছে। মাঝখানে রাস্তাটি কামারবাড়ি রোড নামের একটি পুরাতন ৩.০৫ মি চওড়া রাস্তাকে কাট করেছে। এই কামারবাড়ি রোড রাস্তাটি বাগজোলা খালের উত্তরে নবনির্মিত মূল এম.এ.আর-কে ডি পি এস মেগাসিটি স্কুলের পাশ দিয়ে গিয়ে ভোজেরহাটের রাস্তাকে কানেক্ট করেছে। রাস্তাটি পুরাতন ও রাস্তার ধারে গ্রাম রয়েছে। সুতরাং অন্য জায়গায় যেমন ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে বিনা বাধায় রাস্তা হয়ে গেছে, এখানে বসবাসকারী মানুষ, যাঁরা রাস্তা বানানোর জন্য উচ্ছেদ হবেন তাঁরা তো বাধা দিতেই পারেন। এছাড়া রাস্তার এলাইনমেন্ট বৌদ্ধ চাকমাদের একটি স্কুলের মাঠের প্রায় পুরোটাই খেয়ে নিচ্ছে। এই বৌদ্ধ চাকমারা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। বাংলাদেশের ইসলামী সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের দখল নিতে একসময় সেনাবাহিনী ও ক্রিমিনালদের একজোট করে বৌদ্ধ চাকমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বৌদ্ধ বিহার ভেঙে মসজিদ বানিয়ে রিলিজিয়াস ক্লিনসিং করে ওখানে ইসলামী সেটেলমেন্ট করার স্কিম নিয়ে প্রায় ৯০% সাকসেস পেয়েছিল। মিডিয়া বা কোন রাজনৈতিক দল এই জেনোসাইডের বা মাস এক্সোডাসের মর্মান্তিক ব্যাপারটাগুলোকে কখনো হাইলাইট করেনি। হয়তো ঘটনাটি পাবলিসিটি দেওয়া সেই সময় পলিটিক্যালি কারেক্ট ছিল না। সেই অত্যাচারিত দেশচ্যুত রেফিউজি চাকমারা রাজারহাটের ওই পতিত, জোলো জমিতে একটি মাথা গোঁজার ঠাই, ইস্কুল, ইত্যাদি বানিয়েছিল। এখন ঘটনা হচ্ছে, সরকার রাস্তা বানানোর জন্য আইনমতে জমি অধিগ্রহণ করে নিয়েছে কিন্তু লোকজন জায়গা ছাড়ছে না। অতএব রাজারহাট এলাকার বিধায়ক একদিন ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে ওই সব অবুঝ মানুষদের জমি ছাড়ার উপকারিতা নিয়ে বোঝাতে গেলেন। প্রথম অকুস্থল চাকমা স্কুল। হেডমাস্টারকে ফরমান দিয়ে দেওয়া হল জায়গা ছাড়ার। চাকমাদের বাংলা বলাতে এমনি একটু সমস্যা আছে। একটু আমতা আমতা করে হেডমাস্টার মশাই যখন বললেন তাঁরা কোর্টে যেতে পারেন, বিধায়ক তাঁদের সাফ জানিয়ে দিলেন, একবার বাংলাদেশের ভিটেমাটি ছেড়ে এখানে এসেছেন, কোর্টে গেলে এখানকার ভিটেমাটিও চাটি হয়ে যাবার সম্ভাবনা। দয়াপরবশ হয়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ারদের নির্দেশ দিলেন দেওয়াল ভেঙ্গে স্কুলের জমি নেবার পর যেটুকু জায়গা পড়ে থাকবে, সেখানে যেন ডিপার্টমেন্টই নিজের খরচে পাঁচিল বানিয়ে দেয়। প্রবলেম সল্ভড। ওখানে আর কোন ঝামেলা হয়নি। কিন্তু সমস্যা দাঁড়াল পুরনো রাস্তার সঙ্গে কাটিংয়ের জায়গাটি নিয়ে। ওখানে রাস্তা নিয়ে যেতে গেলে একটি প্রাচীন বটগাছ ও তার তলার শীতলা মন্দিরটি ভাঙ্গা পড়ছে। গ্রামের বউ-ঝিরা এসে বলল ওই গাছ কাটলে বা মন্দির ভাঙ্গতে গেলে আমাদের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। বিধায়ক তো হেসেই খুন। এটা একটা মন্দির হল? তোরা মন্দির দেখেছিস? যা গিয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির বিড়লা মন্দির দেখে আয়। এখানে এমন মন্দির বানিয়ে দেব, বিদেশীরা গাড়ি চেপে দেখতে আসবে। সেই সময় ওই গ্রামের লোকেরা কলকাতা চিনলেও বালিগঞ্জ ফাঁড়ি বা সেখানকার বিড়লা মন্দির সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। তাই তারা খুব একটা কনভিন্সড হল না। এরপর শুরু হল রাস্তার এলাইনমেন্ট দেওয়া। একটি লোক এসে কেঁদে পড়ল, তার ভিটেমাটি পুরোটাই চলে যাচ্ছে। তার বাড়ির ওপর দিয়ে যেন রাস্তা না যায়। অন্তত কিছুটা যদি বাঁচানো যায়। বিধায়ক আমাদের বললেন এলাইনমেন্ট একটু সরানো যাবে কিনা। কিন্তু সরাতে গেলে একটা বাজে হোরাইজোন্টাল কার্ভ চলে আসছে, আর প্রস্তাবিত রাস্তাটি অধিগ্রহণ করা জমির বাইরে চলে যাচ্ছে। বিধায়ক ব্যাপারটা বুঝলেন। এবার ওই লোকটিকে বিধায়ক যে ডায়লগ দিয়েছিলেন, তা জীবনেও ভুলবো না। "তুই এখন আমাকে বলছিস আমার বাড়িটা বাঁচিয়ে দিন, আর রাস্তার মাঝখানে যখন বাড়ি করেছিলি, তখন মনে ছিল না?" পলিটিশিয়ানদের আই কিউ যে আমাদের মত ইঞ্জিনিয়ারদের ১০০ গুণ, সেদিন মালুম হয়েছিল।
Saturday, March 26, 2016
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment