যাদবপুরে ক্লাস শুরু হয়েছে মাস ঘুরতে যায়। শোনা গেল হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরোবে। টুয়েলভে উঠে বায়োলজি নিয়েছি, ইংরেজি মাধ্যমের বই ছিল না, অথচ ক্লাস নোট্ ইংরেজিতে এবং তারই ভরসায় পরীক্ষা দিয়েছি ইংরেজিতে। ক্লাসের অনেকে বাকি সাবজেক্টগুলো ইংরেজিতে দিয়ে বায়োলজি পরীক্ষা বাংলায় দিয়েছিল। তা যাই হোক, দেখলাম হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট নিয়ে আমরা ১০-১২ জন ছাড়া, বাকিদের কোন চাপ নেই। কি ব্যাপার, জানা গেল, সিভিলের ৬০ জন ছাত্রের আমরা ১০-১২ জন বাদে বাকি সব আগের বছর, তার আগের বছর বা তারও আগের বছরের হায়ার সেকেন্ডারী। প্রতি বছর জয়েন্ট দিতে দিতে এবারে চাঁদমারি লাগিয়েছে। ওদিকে প্যারালালি বিএসসি কোর্সও কারো কারো কমপ্লিট হয়ে গেছে। যথারীতি শ্যামবাজারে গেজেট দেখলাম। এবারে ডিভিশনের সঙ্গে গেজেটে নম্বর দেওয়া ছিল। ৬১৯ পেয়েছিলাম। তখন মাধ্যমিকের মতন ফোর্থ সাবজেক্টের নম্বর যোগ হত না। আমাদের কলেজে শ্যামলী বসুমল্লিক নামে একটি মেয়ে ছিল। সে জয়েন্ট দেয়নি, কারণ হিসেবে বলেছিল, যদি সে চান্স পেয়ে যায়, তার বাবার তাকে খরচা করে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর সামর্থ নেই। এই ধারণাটা যে কত বড় ভুল, তার প্রমাণ হল, আমাদের যাদবপুরের মাসমাইনে ছিল ১৫ টাকা। সুতরাং চার বছর যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মোট খরচ লেগেছিল ৭২০ টাকা। তাও অর্ধেক ছেলে নানারকম স্কলারশিপ পেত এবং ওই টাকাটাও তাদের দিতে হয়নি। একবার কানে এল, জে. ইউ. মানে জালি ইউনিভার্সিটি। এখানে নানারকম কোটায় নানারকম জালি ছেলেরা জয়েন্ট এনট্রান্সকে বাইপাস করে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়। সিডিউল কাস্ট ও ট্রাইব কোটা তো ছিলই। তার সঙ্গে স্পোর্টস ও এলামনি কোটা আছে। এছাড়া উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের জন্যও কোটা ছিল। এই যে একটা ধারণা আছে, কোটায় যারা ঢুকবে, তাদের মাথায় কিছু নেই, এই ধারনাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। আমাদের সঙ্গে কোটায় উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে দুজন ছাত্রছাত্রী ঢুকেছিল, মেয়েটি পাশ করে গিয়েছিল, কিন্তু গজেন্দ্র বি ই কমপ্লিট করতে পারে নি। স্পোর্টস কোটায় যারা ঢুকেছিল, তাদের একজন আমার দপ্তরেই চাকরি করছে দাপটের সাথে, আরেকজন দিল্লীতে সি এস আই আর-এ সায়েন্টিস্ট পদে জয়েন করেছিল - এখন অনেক উঠে গেছে, আরেকজন সাকসেসফুলি ভারতের একটি বিখ্যাত প্রাইভেট সেক্টরে কোম্পানিতে চাকরি করছে। আরেকটি স্পোর্টস কোটার ছেলে, খুব ভালো ফুটবল খেলত, নামটা মনে পড়ছে না, তার বাবা ছিল ইরিগেশনের কন্ট্রাক্টর, অবশ্য কোর্স কমপ্লিট করেনি। শুনেছিলাম ফুটবল খেলা ও বাবার বিরাট ঠিকাদারী ব্যবসায় সময় দিয়ে বি ই পড়ার সময়ই সে পায়নি। এলামনি কোটায় যে ছেলেটি ঢুকেছিল, সে কোনরকমে পাস করে সরকারী দপ্তরে সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে ঢুকেছিল, প্রমোশনের পরীক্ষা না দিয়ে ওই পদেই রয়ে গেছে। ফোর্থ ইয়ারে আমরা প্রায় সবাই সর্বভারতীয় আই ই এস পরীক্ষা দিয়েছিলাম। চান্স পেয়েছিল আমাদের দুজন শিডিউল্ড কাস্ট সতীর্থ। দুজনেই পেয়েছিল আই ই এস-এর উচ্চতম ক্যাটেগরিতে, অর্থাৎ ইন্ডিয়ান রেলওয়ে সার্ভিসে। দীর্ঘদিন আগেই তারা একজন পূর্ব রেল ও আরেকজন দক্ষিন পূর্ব রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেছে। অবশ্য এটা সকলে খুব ভালোভাবেই জানেন যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাওয়াটাই একটু শক্ত, কিন্তু একবার ঢুকে যেতে পারলে গরু-গাধা সকলেই সাপ্লি-টাপ্লি দিয়ে চার বছরে পাশ করে যায়, কারণ ক্লাসগুলো যদি ফেল করা ছাত্রে ভর্তি থাকে, নতুন ছাত্ররা বসবে কোথায়? ফ্যাক্টরিতে যেমন মাল প্রডাকশন হয়, অনেকটা তেমনই সাপ্লাই চেন সিস্টেমের মত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররা ফার্স্ট ইয়ারে র' মাল হিসেবে ঢুকে ফোর্থ ইয়ারে ফিনিশড মাল হিসেবে বেরিয়ে আসে। আমাদের সময় পশ্চিমবঙ্গে চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল, এখন সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। সুতরাং মালের সাপ্লাইও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। ডিমান্ডও নিশ্চয়ই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে, কারণ কেউ তো পাশ করে বসে আছে বলে শুনি না।
Thursday, March 24, 2016
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment