দোলযাত্রা বা হোলির সঙ্গে ভাং বা সিদ্ধির সম্পর্ক খুব নিবিড়। এছাড়া ঘটিরা বিজয়া দশমীর দিন সিদ্ধি খাবেই। ওটা পুজোর অঙ্গ। আর যারা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র ছিলেন, তাঁরা তো নিশ্চয়ই এর মহিমা খুব ভালোভাবেই জানেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভাং তথা সিদ্ধি জিনিসটি ডেঞ্জারাস। একবার বড়বাজারে সত্যনারায়ণ পার্কের পাশের গলি দিয়ে হ্যারিসন স্ট্রিটের দিকে আসছি। পাশেই পড়েছে বিখ্যাত সিদ্ধির শরবতের নন-ডেসক্রিপট দোকানটি। তখন ভর দুপুর। এরা অপূর্ব বাদামের শরবতও বানায়। ভাবলাম এক গ্লাস পেস্তা বাদামের শরবত মেরে দিয়ে যাই। হঠাত দেখি একটা খোট্টা মুটে এসে এক গ্লাস জলে একটা টেবিল টেনিস বলের সাইজের সবুজ গোল্লা ফেলে ঢকঢক করে গিলে ফেলল, তারপর আবার এক গ্লাস জল খেয়ে চলে গেল। আমার কৌতুহল হল। শুনলাম ওটা কাঁচা সিদ্ধিবাটার গোলা। আমিও একটি গোলা এক গ্লাস জল দিয়ে গিলে ফেললাম। যা হয় কপালে। গোলাটায় কেমন বুনো বুনো জংলি গন্ধ। মদ খেলে যেমন শরীরে একটা পরিবর্তন টের পাওয়া যায়, এতে তেমন কিছুই হল না। হ্যারিসন রোডে এসে পড়লাম। কিন্তু ফুটপাথ খুঁজে পাচ্ছি না। চারিদিক দিয়েই গাড়ি যাচ্ছে। শেষে গাড়ি চাপা পড়ে মরব নাকি? কোনরকমে একটা শিয়ালদাগামী ট্রামে উঠলাম। ট্রাম চলছে। দুপাশে দেখতে পাচ্ছি ধুধু মাঠ, বন-জঙ্গল-বাগান। চাষীরা ক্ষেতে চাষ করছে। তাদের বৌয়ের দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে বড় বড় পুকুর। গ্রামের ছেলেরা সাঁতার দিচ্ছে, মেয়েরা বাসন মাজছে, বউ-ঝিরা জল নিতে এসেছে। হাওড়া-শিয়ালদার মাঝে হ্যারিসন রোডের দুপাশে গ্রাম-বাংলার যে রূপ দেখেছিলাম, একমাত্র জীবনানন্দ দাশ ছাড়া আর কেউ তা দেখার সুযোগ পাননি। তাই তিনি লিখেছিলেন - বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, পৃথিবীর রূপ তাই খুঁজিতে যাই না আর। রাজাবাজার ট্রাম ডিপোয় এসে হুঁশ এল। কোথায় গ্রামদেশ, এতো কংক্রিটের খাঁচা। কি করে বাড়ি ফিরলাম, সেসব বিবরণ দিয়ে মা মাটি মানুষকে বোর করতে চাই না। কন্ঠনালী পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। জল খেয়ে সে তেষ্টা যাবার নয়। রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে বারবার মনে হচ্ছে শূন্যে উঠে যাচ্ছি। সিলিং-এ ধাক্কা লাগার ভয়ে হাত বাড়িয়ে ধাক্কা আটকানোর চেষ্টা করছি। এরকম অবস্থা পরের দিনও ছিল। তাই বলছি, সিদ্ধি-গাঁজা খাবেন না। ওসব সাধকদের জন্যে। যাঁরা সিদ্ধিলাভ করে গেছেন, তাঁদের জন্যে। আম আদমীর জন্য সুরাই ভাল। সাধে কি ওমর খৈয়াম সাহেব সেই মধ্যযুগে রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়ামে বলে গেছেন - এই সরাইয়ের পান্শালাতে / ঠিক করেছি আমার বাস / একুল-ওকুল দুকুল বেচে / থাকবো হয়ে সুরার দাস / আশীর্বাদের নেইকো আশা / ভয় করিনা অভিশাপে / স্বর্গলোভে হইনি পাগল / দেইনিকো ডুব অধঃপাতে / চাইনা আমি ছাড়িয়ে যেতে / পঞ্চভূতের স্নেহের মায়া / থাকবো পড়ে এইখানেতেই / জড়িয়ে ধরে যমের ছায়া।
Thursday, March 24, 2016
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment