Saturday, March 26, 2016

My memoirs - death of Indira Gandhi

১৯৮৪ সালের ৩১সে অক্টোবর। সবে বি ই পাস করে স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার ট্রেনি হয়ে ঢুকেছি। পোস্টিং নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের সেভেন্থ ফ্লোরে প্ল্যানিং এন্ড ডিজাইন বিভাগ। অফিসের ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই শোনা গেল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর নিজেরই শিখ দেহরক্ষীদের হাতে খুন হয়েছেন। এর কিছুদিন আগেই ঘটে গেছে স্বর্ণমন্দির ambush কান্ড, যাতে খলিস্তানি শিখরা ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিল।যেহেতু তখন মোবাইল ফোন ইত্যাদি কিছুই ছিল না খবরটার সত্যতা যাচাই করা যাচ্ছে না। আমরা গিয়ে জড়ো হলাম হেয়ার স্ট্রিটে পি.টি.আই. দপ্তরের সামনে। সেখানে হাজার লোকের ভিড়। নানারকম গুজব শোনা যাচ্ছে। অবশেষে খবর মিলল। পি.টি.আই. অফিসের সামনে নোটিস লাগিয়ে দিয়ে গেল যে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজের বাসভবনে নিজেরই শিখ দেহরক্ষীর হাতে খুন হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়েই চারিদিকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হল। গাড়িঘোড়া, দোকানপাট, অফিসকাছারী সব বন্ধ হয়ে গেল। আর শোনা গেল দিকে দিকে শিখ-নিধন চলছে। শিখরা প্রাণভয়ে চুল দাড়ি কেটে ফেলছে ও বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। গাড়ি ঘোড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকলেই হেঁটে বাড়ি যাবার প্রস্তুতি নিল। রেলে করে যাঁরা অফিস আসতেন, তাঁরা রেল লাইন ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। আমার এক পরিচিত অসুস্থ মহিলা নিউ সেক্রেটারিয়েট থেকে হেঁটে শিয়ালদা-নৈহাটি রেল লাইন ধরে বেল্ঘরিয়ায় নিজের বাড়ি গিয়েছিলেন। আমরা বাসরুট ধরে হাঁটছি। পিজি হাসপাতাল পেরিয়ে হরিশ মুখার্জি স্ট্রিট ধরে যাচ্ছি। হঠাত দেখি এক জায়গায় গন্ডগোল লেগেছে। কাছে গিয়ে দেখি একটি রোগা ছেলে এক স্বাস্থ্যবান শিখ যুবককে চুলের মুঠি ধরে পিটিয়ে যাচ্ছে। শিখ যুবকটি কোন প্রতিবাদ করছে না। আশপাশের কিছু লোক মজা নিতে জড়ো হয়েছে, কেউ কেউ যোগদানও করছে। স্বাভাবিক অবস্থায় শিখ্টি ওই ছেলেটিকে এক চড় মারলে, দ্বিতীয়টি মারার জায়গা থাকবে না। শিখদের প্রপার্টিতে আগুনও দেওয়া হচ্ছিল। অনেক সেলুনে শিখদের চুল কাটতে ১০০ টাকা করেও নেওয়া হচ্ছিল। তখনকার দিনের ১০০ টাকা মানে এখনকার দিনের ১০০০ টাকার চেয়েও বেশি। হাঁটতে হাঁটতে রাসবিহারী মোড়ে এসে দেখলাম অগ্নিগর্ভ অবস্থা। রাসবিহারী মোড়ের বিখ্যাত বচ্চন সিংয়ের হোটেল ভাংচুর হয়ে বন্ধ। রাসবিহারী গুরুদ্বারের সামনে একটি গাড়ি জ্বলছে। কিছু পুলিশ গুরুদ্বার গার্ড দিতে এসেছে। গুরুদ্বারের পূর্ব দিকে রাসবিহারী এভিনিউয়ের ওপর মারমুখী জনতা পুলিসের সঙ্গে খন্ডযুদ্ধ করছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছে। শীতলা মন্দিরের কাছে পাবলিক কিছু বালতিতে জল ভরে রেখে দিয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের শেলগুলো বালতির জলে চুবিয়ে নিচ্ছে আর তুলে নিয়ে পুলিশের দিকে উল্টে ছুঁড়ে দিচ্ছে। পাবলিকের মধ্যে মেয়েরা বাচ্চারা সবাই ছিল। ব্যাপারটা কি না জেনেই হুজুগ দেখতে এসেছে। চারিদিকে একটা প্লাস্টিক পোড়া গন্ধ, চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। পুলিশ তেড়ে আসলে পাবলিক পেছিয়ে আসছে, আবার কিছুক্ষণ বাদে উল্টে তেড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ চলছে সমানে সমানে। এভাবে কিছুক্ষণ যাবার পর পুলিশ এগিয়ে এল। পাবলিকের সঙ্গে আমরা তখন শীতলা মন্দিরের গলিতে ঢুকে পড়েছি। একটা দুম শব্দের পর সামনের একটি দেওয়ালের খানিকটা প্লাস্টার খসে পড়ল। মানে এবার পুলিশ যা ছুঁড়ছে তা কাঁদানে গ্যাস নয়, গুলি। প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলাম সেদিন। রাসবিহারীর দিক দিয়ে না বেরিয়ে শা'নগরের দিক দিয়ে ঘুরে কেওড়াতলা শ্বশানের সামনে দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে এলাম। পরে শুনেছিলাম মাটালিবাগানের পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে আমারই মত হুজুগ দেখতে গিয়ে ওই দিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। সেদিন কান ঘেঁষে চলে যাওয়া গুলিটা তো আমার গায়েও লাগতে পারত। তখন কি জীবনানন্দ দাশের মত বলতে পারতাম - হয়তো গুলির শব্দ আবার / আমাদের স্তব্ধতা / আমাদের শান্তি / আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না / থাকত না আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো সাধের ব্যার্থতা ও অন্ধকার / আমি যদি বনহংস হতাম / বনহংসী হতে যদি তুমি / কোনো এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে / ধানক্ষেতের কাছে।

My memoirs - HIDCO

অনেকদিন আগেকার কথা। রাজারহাটে উপনগরী তৈরী হচ্ছে। প্রথম ধাপ হিসেবে ভেড়ির মাটি কেটে জমি ভরাট আর রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। প্রধান রাস্তাটি এখন সকলেই চেনেন, ১০ (৬+৪) লেনের এম.এ.আর বা মেজর অর্টেরিয়াল রোড। এটির কাজ প্রথম শুরু হয়। রাস্তাটি সেক্টর ফাইভের লাগোয়া কেষ্টপুর ক্যানাল এন.বি.সি.সি ব্রিজ দিয়ে পার করে শুরু হয়েছে এবং থার্ড রোটারি ও সিক্সথ রোটারিতে দুটি লেফট টার্ন নিয়ে শেষ হয়েছে ভি আই পি রোডের ওপর হলদিরামের উল্টো দিকে একটি রাইট টার্নিং ফ্লাইওভারে। কিন্তু প্রোজেক্ট এরিয়া রাজারহাট রোড পর্যন্ত। এই রাস্তাটির কাজও খুব নির্বিঘ্নে হয়নি। অ্যাকশন এরিয়া টু-তে, বাগজোলা ক্যানেল পেরিয়ে রাস্তার এলাইনমেন্টে একটি কবরস্থান ছিল। ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে কবরগুলি রিলোকেট করে রাস্তার এই অংশের কাজটি একরাতে কমপ্লিট করা হয়েছিল। নিউ টাউনে মূল এম.এ.আর ছাড়াও আরো অনেকগুলি এম.এ.আর আছে, যেমন ইস্ট-ওয়েস্ট এম.এ.আর, নর্থ-সাউথ এম.এ.আর, সাদার্ণ ও নর্দার্ণ এম.এ.আর, ইত্যাদি। নর্থ-সাউথ এম.এ.আরের কাজ শুরু হবার পর জমি নিয়ে সমস্যা শুরু হল। নর্থ-সাউথ এম.এ.আর রাজারহাটের কদমপুকুর মৌজায়। এটি সিক্সথ রোটারি থেকে পশ্চিম দিকে বেরিয়ে বাগজোলা খালের উত্তরে যেখানে এখন ইকোস্পেস হয়েছে, সেই জায়গাটিকে কানেক্ট করেছে। মাঝখানে রাস্তাটি কামারবাড়ি রোড নামের একটি পুরাতন ৩.০৫ মি চওড়া রাস্তাকে কাট করেছে। এই কামারবাড়ি রোড রাস্তাটি বাগজোলা খালের উত্তরে নবনির্মিত মূল এম.এ.আর-কে ডি পি এস মেগাসিটি স্কুলের পাশ দিয়ে গিয়ে ভোজেরহাটের রাস্তাকে কানেক্ট করেছে। রাস্তাটি পুরাতন ও রাস্তার ধারে গ্রাম রয়েছে। সুতরাং অন্য জায়গায় যেমন ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে বিনা বাধায় রাস্তা হয়ে গেছে, এখানে বসবাসকারী মানুষ, যাঁরা রাস্তা বানানোর জন্য উচ্ছেদ হবেন তাঁরা তো বাধা দিতেই পারেন। এছাড়া রাস্তার এলাইনমেন্ট বৌদ্ধ চাকমাদের একটি স্কুলের মাঠের প্রায় পুরোটাই খেয়ে নিচ্ছে। এই বৌদ্ধ চাকমারা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। বাংলাদেশের ইসলামী সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের দখল নিতে একসময় সেনাবাহিনী ও ক্রিমিনালদের একজোট করে বৌদ্ধ চাকমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বৌদ্ধ বিহার ভেঙে মসজিদ বানিয়ে রিলিজিয়াস ক্লিনসিং করে ওখানে ইসলামী সেটেলমেন্ট করার স্কিম নিয়ে প্রায় ৯০% সাকসেস পেয়েছিল। মিডিয়া বা কোন রাজনৈতিক দল এই জেনোসাইডের বা মাস এক্সোডাসের মর্মান্তিক ব্যাপারটাগুলোকে কখনো হাইলাইট করেনি। হয়তো ঘটনাটি পাবলিসিটি দেওয়া সেই সময় পলিটিক্যালি কারেক্ট ছিল না। সেই অত্যাচারিত দেশচ্যুত রেফিউজি চাকমারা রাজারহাটের ওই পতিত, জোলো জমিতে একটি মাথা গোঁজার ঠাই, ইস্কুল, ইত্যাদি বানিয়েছিল। এখন ঘটনা হচ্ছে, সরকার রাস্তা বানানোর জন্য আইনমতে জমি অধিগ্রহণ করে নিয়েছে কিন্তু লোকজন জায়গা ছাড়ছে না। অতএব রাজারহাট এলাকার বিধায়ক একদিন ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে ওই সব অবুঝ মানুষদের জমি ছাড়ার উপকারিতা নিয়ে বোঝাতে গেলেন। প্রথম অকুস্থল চাকমা স্কুল। হেডমাস্টারকে ফরমান দিয়ে দেওয়া হল জায়গা ছাড়ার। চাকমাদের বাংলা বলাতে এমনি একটু সমস্যা আছে। একটু আমতা আমতা করে হেডমাস্টার মশাই যখন বললেন তাঁরা কোর্টে যেতে পারেন, বিধায়ক তাঁদের সাফ জানিয়ে দিলেন, একবার বাংলাদেশের ভিটেমাটি ছেড়ে এখানে এসেছেন, কোর্টে গেলে এখানকার ভিটেমাটিও চাটি হয়ে যাবার সম্ভাবনা। দয়াপরবশ হয়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ারদের নির্দেশ দিলেন দেওয়াল ভেঙ্গে স্কুলের জমি নেবার পর যেটুকু জায়গা পড়ে থাকবে, সেখানে যেন ডিপার্টমেন্টই নিজের খরচে পাঁচিল বানিয়ে দেয়। প্রবলেম সল্ভড। ওখানে আর কোন ঝামেলা হয়নি। কিন্তু সমস্যা দাঁড়াল পুরনো রাস্তার সঙ্গে কাটিংয়ের জায়গাটি নিয়ে। ওখানে রাস্তা নিয়ে যেতে গেলে একটি প্রাচীন বটগাছ ও তার তলার শীতলা মন্দিরটি ভাঙ্গা পড়ছে। গ্রামের বউ-ঝিরা এসে বলল ওই গাছ কাটলে বা মন্দির ভাঙ্গতে গেলে আমাদের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। বিধায়ক তো হেসেই খুন। এটা একটা মন্দির হল? তোরা মন্দির দেখেছিস? যা গিয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির বিড়লা মন্দির দেখে আয়। এখানে এমন মন্দির বানিয়ে দেব, বিদেশীরা গাড়ি চেপে দেখতে আসবে। সেই সময় ওই গ্রামের লোকেরা কলকাতা চিনলেও বালিগঞ্জ ফাঁড়ি বা সেখানকার বিড়লা মন্দির সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। তাই তারা খুব একটা কনভিন্সড হল না। এরপর শুরু হল রাস্তার এলাইনমেন্ট দেওয়া। একটি লোক এসে কেঁদে পড়ল, তার ভিটেমাটি পুরোটাই চলে যাচ্ছে। তার বাড়ির ওপর দিয়ে যেন রাস্তা না যায়। অন্তত কিছুটা যদি বাঁচানো যায়। বিধায়ক আমাদের বললেন এলাইনমেন্ট একটু সরানো যাবে কিনা। কিন্তু সরাতে গেলে একটা বাজে হোরাইজোন্টাল কার্ভ চলে আসছে, আর প্রস্তাবিত রাস্তাটি অধিগ্রহণ করা জমির বাইরে চলে যাচ্ছে। বিধায়ক ব্যাপারটা বুঝলেন। এবার ওই লোকটিকে বিধায়ক যে ডায়লগ দিয়েছিলেন, তা জীবনেও ভুলবো না। "তুই এখন আমাকে বলছিস আমার বাড়িটা বাঁচিয়ে দিন, আর রাস্তার মাঝখানে যখন বাড়ি করেছিলি, তখন মনে ছিল না?" পলিটিশিয়ানদের আই কিউ যে আমাদের মত ইঞ্জিনিয়ারদের ১০০ গুণ, সেদিন মালুম হয়েছিল।
LikeShow more r

Thursday, March 24, 2016

My memoirs - Entry in J.U.

যাদবপুরে ক্লাস শুরু হয়েছে মাস ঘুরতে যায়। শোনা গেল হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরোবে। টুয়েলভে উঠে বায়োলজি নিয়েছি, ইংরেজি মাধ্যমের বই ছিল না, অথচ ক্লাস নোট্ ইংরেজিতে এবং তারই ভরসায় পরীক্ষা দিয়েছি ইংরেজিতে। ক্লাসের অনেকে বাকি সাবজেক্টগুলো ইংরেজিতে দিয়ে বায়োলজি পরীক্ষা বাংলায় দিয়েছিল। তা যাই হোক, দেখলাম হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট নিয়ে আমরা ১০-১২ জন ছাড়া, বাকিদের কোন চাপ নেই। কি ব্যাপার, জানা গেল, সিভিলের ৬০ জন ছাত্রের আমরা ১০-১২ জন বাদে বাকি সব আগের বছর, তার আগের বছর বা তারও আগের বছরের হায়ার সেকেন্ডারী। প্রতি বছর জয়েন্ট দিতে দিতে এবারে চাঁদমারি লাগিয়েছে। ওদিকে প্যারালালি বিএসসি কোর্সও কারো কারো কমপ্লিট হয়ে গেছে। যথারীতি শ্যামবাজারে গেজেট দেখলাম। এবারে ডিভিশনের সঙ্গে গেজেটে নম্বর দেওয়া ছিল। ৬১৯ পেয়েছিলাম। তখন মাধ্যমিকের মতন ফোর্থ সাবজেক্টের নম্বর যোগ হত না। আমাদের কলেজে শ্যামলী বসুমল্লিক নামে একটি মেয়ে ছিল। সে জয়েন্ট দেয়নি, কারণ হিসেবে বলেছিল, যদি সে চান্স পেয়ে যায়, তার বাবার তাকে খরচা করে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর সামর্থ নেই। এই ধারণাটা যে কত বড় ভুল, তার প্রমাণ হল, আমাদের যাদবপুরের মাসমাইনে ছিল ১৫ টাকা। সুতরাং চার বছর যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মোট খরচ লেগেছিল ৭২০ টাকা। তাও অর্ধেক ছেলে নানারকম স্কলারশিপ পেত এবং ওই টাকাটাও তাদের দিতে হয়নি।  একবার কানে এল, জে. ইউ. মানে জালি ইউনিভার্সিটি। এখানে নানারকম কোটায় নানারকম জালি ছেলেরা জয়েন্ট এনট্রান্সকে বাইপাস করে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়। সিডিউল কাস্ট ও ট্রাইব কোটা তো ছিলই। তার সঙ্গে স্পোর্টস ও এলামনি কোটা আছে। এছাড়া উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের জন্যও কোটা ছিল। এই যে একটা ধারণা আছে, কোটায় যারা ঢুকবে, তাদের মাথায় কিছু নেই, এই ধারনাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। আমাদের সঙ্গে কোটায় উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে দুজন ছাত্রছাত্রী ঢুকেছিল, মেয়েটি পাশ করে গিয়েছিল, কিন্তু গজেন্দ্র বি ই কমপ্লিট করতে পারে নি। স্পোর্টস কোটায় যারা ঢুকেছিল, তাদের একজন আমার দপ্তরেই চাকরি করছে দাপটের সাথে, আরেকজন দিল্লীতে সি এস আই আর-এ সায়েন্টিস্ট পদে জয়েন করেছিল - এখন অনেক উঠে গেছে,  আরেকজন সাকসেসফুলি ভারতের একটি বিখ্যাত প্রাইভেট সেক্টরে কোম্পানিতে চাকরি করছে। আরেকটি স্পোর্টস কোটার ছেলে, খুব ভালো ফুটবল খেলত, নামটা মনে পড়ছে না, তার বাবা ছিল ইরিগেশনের কন্ট্রাক্টর, অবশ্য কোর্স কমপ্লিট করেনি। শুনেছিলাম ফুটবল খেলা ও বাবার বিরাট ঠিকাদারী ব্যবসায় সময় দিয়ে বি ই পড়ার সময়ই সে পায়নি। এলামনি কোটায় যে ছেলেটি ঢুকেছিল,  সে কোনরকমে পাস করে সরকারী দপ্তরে সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে ঢুকেছিল, প্রমোশনের পরীক্ষা না দিয়ে ওই পদেই রয়ে গেছে। ফোর্থ ইয়ারে আমরা প্রায় সবাই সর্বভারতীয় আই ই এস পরীক্ষা দিয়েছিলাম। চান্স পেয়েছিল আমাদের দুজন শিডিউল্ড কাস্ট সতীর্থ। দুজনেই পেয়েছিল আই ই এস-এর উচ্চতম ক্যাটেগরিতে, অর্থাৎ ইন্ডিয়ান রেলওয়ে সার্ভিসে। দীর্ঘদিন আগেই তারা একজন পূর্ব রেল ও আরেকজন দক্ষিন পূর্ব রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেছে। অবশ্য এটা সকলে খুব ভালোভাবেই জানেন যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাওয়াটাই একটু শক্ত, কিন্তু একবার ঢুকে যেতে পারলে গরু-গাধা সকলেই সাপ্লি-টাপ্লি দিয়ে চার বছরে পাশ করে যায়, কারণ ক্লাসগুলো যদি ফেল করা ছাত্রে ভর্তি থাকে, নতুন ছাত্ররা বসবে কোথায়? ফ্যাক্টরিতে যেমন মাল প্রডাকশন হয়, অনেকটা তেমনই সাপ্লাই চেন সিস্টেমের মত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররা ফার্স্ট ইয়ারে র' মাল হিসেবে ঢুকে ফোর্থ ইয়ারে ফিনিশড মাল হিসেবে বেরিয়ে আসে। আমাদের সময় পশ্চিমবঙ্গে চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল, এখন সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। সুতরাং মালের সাপ্লাইও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। ডিমান্ডও নিশ্চয়ই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে, কারণ কেউ তো পাশ করে বসে আছে বলে শুনি না।

Doljatra & Bhang (Siddhi)

দোলযাত্রা বা হোলির সঙ্গে ভাং বা সিদ্ধির সম্পর্ক খুব নিবিড়। এছাড়া ঘটিরা বিজয়া দশমীর দিন সিদ্ধি খাবেই। ওটা পুজোর অঙ্গ। আর যারা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র ছিলেন, তাঁরা তো নিশ্চয়ই এর মহিমা খুব ভালোভাবেই জানেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভাং তথা সিদ্ধি জিনিসটি ডেঞ্জারাস। একবার বড়বাজারে সত্যনারায়ণ পার্কের পাশের গলি দিয়ে হ্যারিসন স্ট্রিটের দিকে আসছি। পাশেই পড়েছে বিখ্যাত সিদ্ধির শরবতের নন-ডেসক্রিপট দোকানটি। তখন ভর দুপুর। এরা অপূর্ব বাদামের শরবতও বানায়। ভাবলাম এক গ্লাস পেস্তা বাদামের শরবত মেরে দিয়ে যাই। হঠাত দেখি একটা খোট্টা মুটে এসে এক গ্লাস জলে একটা টেবিল টেনিস বলের সাইজের সবুজ গোল্লা ফেলে ঢকঢক করে গিলে ফেলল, তারপর আবার এক গ্লাস জল খেয়ে চলে গেল। আমার কৌতুহল হল। শুনলাম ওটা কাঁচা সিদ্ধিবাটার গোলা। আমিও একটি গোলা এক গ্লাস জল দিয়ে গিলে ফেললাম। যা হয় কপালে। গোলাটায় কেমন বুনো বুনো জংলি গন্ধ। মদ খেলে যেমন শরীরে একটা পরিবর্তন টের পাওয়া যায়, এতে তেমন কিছুই হল না। হ্যারিসন রোডে এসে পড়লাম। কিন্তু ফুটপাথ খুঁজে পাচ্ছি না। চারিদিক দিয়েই গাড়ি যাচ্ছে। শেষে গাড়ি চাপা পড়ে মরব নাকি? কোনরকমে একটা শিয়ালদাগামী ট্রামে উঠলাম। ট্রাম চলছে। দুপাশে দেখতে পাচ্ছি ধুধু মাঠ, বন-জঙ্গল-বাগান। চাষীরা ক্ষেতে চাষ করছে। তাদের বৌয়ের দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে বড় বড় পুকুর। গ্রামের ছেলেরা সাঁতার দিচ্ছে, মেয়েরা বাসন মাজছে, বউ-ঝিরা জল নিতে এসেছে। হাওড়া-শিয়ালদার মাঝে হ্যারিসন রোডের দুপাশে গ্রাম-বাংলার যে রূপ দেখেছিলাম, একমাত্র জীবনানন্দ দাশ ছাড়া আর কেউ তা দেখার সুযোগ পাননি। তাই তিনি লিখেছিলেন - বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, পৃথিবীর রূপ তাই খুঁজিতে যাই না আর। রাজাবাজার ট্রাম ডিপোয় এসে হুঁশ এল। কোথায় গ্রামদেশ, এতো কংক্রিটের খাঁচা। কি করে বাড়ি ফিরলাম, সেসব বিবরণ দিয়ে মা মাটি মানুষকে বোর করতে চাই না। কন্ঠনালী পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। জল খেয়ে সে তেষ্টা যাবার নয়। রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে বারবার মনে হচ্ছে শূন্যে উঠে যাচ্ছি। সিলিং-এ ধাক্কা লাগার ভয়ে হাত বাড়িয়ে ধাক্কা আটকানোর চেষ্টা করছি। এরকম অবস্থা পরের দিনও ছিল। তাই বলছি, সিদ্ধি-গাঁজা খাবেন না। ওসব সাধকদের জন্যে। যাঁরা সিদ্ধিলাভ করে গেছেন, তাঁদের জন্যে। আম আদমীর জন্য সুরাই ভাল। সাধে কি ওমর খৈয়াম সাহেব সেই মধ্যযুগে রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়ামে বলে গেছেন - এই সরাইয়ের পান্শালাতে / ঠিক করেছি আমার বাস / একুল-ওকুল দুকুল বেচে / থাকবো হয়ে সুরার দাস / আশীর্বাদের নেইকো আশা / ভয় করিনা অভিশাপে / স্বর্গলোভে হইনি পাগল / দেইনিকো ডুব অধঃপাতে / চাইনা আমি ছাড়িয়ে যেতে / পঞ্চভূতের স্নেহের মায়া / থাকবো পড়ে এইখানেতেই / জড়িয়ে ধরে যমের ছায়া।

My memoirs - Passed Higher Secondary

ইলেভেন-টুয়েল্ভের শিক্ষা মানুষের জীবনের ভিত্তি। একটি ছেলে বাকি জীবনে কি করবে, কোন লাইনে তার ন্যাক, কোন লাইনে যাবে, সেটা ওই দুই বছরে, ঠিক হয়ে যায়। আমার কিন্তু ওই দুই বছরের অভিজ্ঞতা সাংঘাতিক ও মর্মান্তিক। মাধ্যমিকের রেজাল্ট মোটামুটি ভালো হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র কোন কলেজ কিরকম এই বিষয়ে অনভিজ্ঞতার কারণে হায়ার সেকেন্ডারিতে ভর্তি হয়েছিলাম আমহার্স্ট স্ট্রিটের সেন্ট পল্স কলেজে। জানা ছিল না যে এটি একটি জঘন্যতম কলেজ। দুবছরে মোট দু মাসও ক্লাস হয়নি। ইলেভেন-টুয়েলভের আমরা ছিলাম সেকেন্ড ব্যাচ। কলেজের মাস্টাররা আমাদের চরম নেগলেক্ট করতেন। ক্লাসই নিতেন না। গরমের ও পুজোর ছুটি মাসের পর মাস। নানারকম পরীক্ষার সিট পড়ার জন্য ছুটি। এছাড়া ছিল ছাত্র পরিষদ আর এস এফ আইয়ের মারপিট। প্রিন্সিপাল সি বি সাউ কে একদিন তো ছাত্র পরিষদের ছেলেরা ডান্ডা মেরে মাথা ফাটিয়ে দিল। কলেজ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ রইল। ১৯৭৮ সালের বন্যাতেও ছুটি ছিল একমাসের ওপর। ক্লাস ইলেভেনে additional subject নিয়েছিলাম Advanced Physics ও Advanced Mathematics। গোটা এক বছর দুটো সাবজেক্টের কোনটারই একটাও ক্লাস হলনা বলে টুয়েলভে উঠে বায়োলজি additional subject নিলাম। যদিও এটা ছিল আমার অপছন্দের সাবজেক্ট। ওই additional সাবজেক্টের নম্বর টোটালে যোগ হত না, কিন্তু বায়োলজি না থাকলে আবার মেডিকাল জয়েন্টে বসা যাবে না। যাই হোক, কলেজে রোজই যেতাম ও ক্লাস হত না বলে কলেজ স্ট্রিটে চলে যেতাম। বাংলা সাহিত্যের পীঠস্থান কফি হাউসে তখন ইনফিউশন অর্থাত কালো কফি পাওয়া যেত ৬০ পয়সায়। ওটা দামেও সস্তা আর আঁতেল হবার ট্রেডমার্ক ছিল। কলেজে পড়ানো হত ইংরাজি মাধ্যমে, কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারির ইংরাজি মাধ্যমের বই তখনও বেরোতে শুরু করে নি, তাই ইন্টারমিডিয়েটের বইগুলোই ছিল আমাদের ভরসা। এই দুবছর প্রচুর পুরনো বইয়ের দোকান ঘুরেছি, বই কিনেছি। আলবার্ট কামুর আউটসাইডার, লোনির ট্রিগনোমেট্রি, লাডলীমোহনের কেমিস্ট্রি, যা পেয়েছি। এছাড়া বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরি ও শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের ভারতী পরিষদের মেম্বার ছিলাম। ইংরেজি পেপারব্যাক পড়ার সেই শুরু। ইয়ান ফ্লেমিং, জেমস হেডলি চেজ, মারিও পুজো, শার্লক হোমস, আগাথা ক্রিস্টি, কিছুই বাদ দিই নি। তখনকার দিনে মেয়েরা শাড়িই পরত। স্কার্ট ব্লাউজ তো দূর সালোয়ার কামিজই চালু হয়নি। কলেজ কম্পাউন্ডের মধ্যে প্রিন্সিপ্যালের কোয়ার্টারের বারান্দায় মাঝে মাঝে আমাদের এংলো ইন্ডিয়ান প্রিন্সিপ্যালের স্কার্ট ব্লাউজ পরিহিত মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। দুধে আলকাতরা প্রিন্সিপ্যালের অমন দুধে আলতা মেয়ে কি করে হল, এটাই ছিল গবেষনার বিষয়। জয়েন্ট এনট্রান্স ইত্যাদি সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা ছিল না। হুজুগে পড়ে কলেজের বন্ধুদের সাথে একদিন শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে যাদবপুর থেকে জয়েন্টের ফর্ম কিনে নিয়ে এলাম। যথারীতি ট্রেনের টিকিট কাটিনি। কারণ সেটা তখন ডিসক্রেডিটের ব্যাপার ছিল। সেই সময় জয়েন্টে দরখাস্ত দেওয়া ছাড়াও যাদবপুর, শিবপুর, দুর্গাপুর, জলপাইগুড়িতে আলাদা ভাবে দরখাস্ত করতে হত। যাদবপুরে ২০ টাকা জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু শিবপুরের জন্য রিজার্ভ ব্যাংকে ৬ টাকার চালান করার দরকার ছিল। রিজার্ভ ব্যাংকে গিয়েও ছিলাম। কিন্তু চালান বানানোর ব্যাপারটা না বুঝতে পেরে এসক্যালেটরে কয়েকবার ওঠানামা করে চলে এসেছিলাম। ভূভারতে তখন কোথাও এসক্যালেটর ছিল না। অর্থাৎ ফাইনালি আমি যাদবপুর ছাড়া আর কোথাও দরখাস্তই করিনি। এটা আমার বাহাদুরি নয়, অজ্ঞতা। আর জয়েন্ট ইত্যাদি নিয়ে আমাদের বাবা-মা-রাও কখনো মাথা ঘামাতেন না। ভবিষ্যতে কিছু একটা হয়ে যাবে, এই ছিল তাঁদের রিয়ালিস্টিক ভাবনাচিন্তা। তা যাই হোক, প্রথম বেরোলো আই আই টি-র রেজাল্ট। ১৫০০-র ওপরে rank ছিল। বাবার সঙ্গে খড়্গপুর গিয়ে মেডিক্যাল দিয়ে এলাম। সপ্তর্ষি মন্ডল বলে একটি ছেলে আমাদের সঙ্গেই মেডিক্যাল দিয়েছিল। নামটা অদ্ভুত বলে আজও মনে আছে। তারপর আই আই টি-র নেহেরু হলে (হোস্টেল) admission, সারারাত ragging, চুল কাটতে যাবার ছুতোয় হোস্টেল থেকে কলকাতা পলায়ন, ইত্যাদি অন্য গল্প। পালিয়ে তো এলাম, তখনও ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোয় নি। একদিন রেজাল্ট বেরিয়েছে শুনে হাওড়া থেকে বাস পাল্টে শিবপুর গেলাম। ২০০০ জনের নাম টাঙ্গিয়েছে। প্রচুর ভিড়। খোঁজাখুজি করে নাম নেই ধরে নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। দুচার দিন পর আমার বন্ধু সুব্রত সেনগুপ্ত ওরফে মুজিবর এসে খবর দিল, যে ও যাদবপুরে লিস্ট দেখতে গিয়েছিল। সেখানে নোটিস বোর্ডের সামনে প্রচন্ড ভিড়। কেউ একজন চেঁচিয়ে নাম পড়ে দিচ্ছিল। সেখানে আমার নাম ডেকেছিল। পরদিন যাদবপুরে গেলাম। বোর্ডে নাম রয়েছে। Rank চারশোর ওপরে এবং তিনশো পর্যন্ত ইন্টারভিউ হয়ে গেছে। পড়িমরি করে ফর্ম জমা দিয়ে সিভিল পেলাম। আগের rank- এর ছেলেরা ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইত্যাদি পেয়েছিল। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে মেডিক্যাল জয়েন্টের সবার নম্বর টাঙিয়ে দিয়েছিল। আমি পেয়েছিলাম ৫০০ তে ১৫০। তাতেও পরে মেডিক্যালের চিঠিও এসেছিল। কিন্তু তখন যাদবপুরে ভর্তি হয়ে গেছি। বন্ধুবান্ধব হয়ে গেছে। অন্য কিছু মাথাতেও আসেনি। গান্ধী ভবনে ওরিয়েন্টেশন, হলুদ ফাইল, হলুদ ফাইল হাতে থাকলে ragging এইসব হল। তারপর যাদবপুরে কাটিয়ে দিলাম চার বছর। বাকী জীবনে যেটুকু করে খাচ্ছি, সে ওই যাদবপুরে যা শিখেছি সেটা ভাঙ্গিয়েই চলছে।

My memoirs - Passed Madhyamik


১৯৭৭ সাল। এক পরিবর্তনের বছর। সে বছর আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা। আমরা ছিলাম মাধ্যমিকের সেকেন্ড ব্যাচ। আগে মাধ্যমিক বলে কিছু ছিল না। ইলেভেনে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা হত। ৫-ই এপ্রিল শুরু হলো আমার জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। পড়তাম শ্যামবাজার এ ভি স্কুলে। হেডমাস্টার ছিলেন এক্স মিলিটারি চন্ডিবাবু। সিট্ পড়ল বিটি রোড গভর্নমেন্ট স্পন্সরড হাই স্কুলে, বিটি রোডের ধারেই। পরীক্ষা দিতে দিতে জানলা দিয়ে বিটি রোডের অলস দুপুরের ট্রাফিক চোখে পড়ত। তখন দুবেলা দুটি পেপার পরীক্ষা হত। প্রথম পরীক্ষার দিন বাড়ি থেকে বাগবাজার বাটা পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে বাস ধরে বাবার সঙ্গে সেন্টারে পৌঁছলাম।যথারীতি প্রথম দিন, প্রথম অর্ধে বাংলা ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা ছিল। প্রথম যে কোশ্চেনের উত্তর লিখেছিলাম সেটি হল - মধ্যাহ্নে কবিতাটির সারাংশ লেখ। প্রায় আধ ঘন্টা নার্ভাসনেসের জন্য হাত কেঁপেছিল। দুটি পরীক্ষার মাঝখানে এক ঘন্টা বিরতিতে ওখানেই বাবার এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে টিফিন খেয়ে নিতাম। আমাদের ভাইভা পরীক্ষাও সেন্টারেই হয়েছিল, নিজের স্কুলে নয়। বাংলা ভাইভাতে কবিতা আবৃত্তি করতে বললে 'আজি এ প্রভাতে রবির কর' কবিতাটি বলেছিলাম।তখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী পরীক্ষা শেষ হবার পর শ্যামবাজারে একটি টাইপ স্কুলে টাইপ শিখেছিলাম। ৪০ পর্যন্ত স্পিড উঠেছিল। সাইকেলের মত টাইপ একবার শিখলে কেউ ভোলে না। তাই আজও ভুলিনি। এছাড়া আমার নেশা ছিল গল্পের বই পড়া।তখন চুটিয়ে গল্পের বই পড়ে নিয়েছি।দেখতে দেখতে পরীক্ষার পর মাসতিনেক কেটে গেল। একদিন শুনলাম মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। ছুটতে ছুটতে গেলাম শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়। কিছু লোক গেজেট বলে একটি পাতলা বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের চারিপাশে গাদা লোক ভিড় করে রেজাল্ট দেখছে। ফার্স্ট ডিভিশন হলে সম্ভবত ১ টাকা, ফেল করলে ১০ পয়সা রেট ছিল। দুরুদুরু বক্ষে আমার রোল নম্বরটি দিলাম। ক্যাল-নর্থ-কিছু একটা। দেখলাম ফার্স্ট ডিভিশন। কনফার্ম করতে আরো দু-এক জায়গায় ভেরিফাই করালাম। তারপর ছুটতে ছুটতে শ্যামবাজার থেকে বাড়ি এসে মাকে আনন্দ সংবাদটি জানালাম। ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করব এটা আমার ধারণার অতীত ছিল, কারণ তখন খুব কমই ফার্স্ট ডিভিশন হত। এরকমও মনে হল, যে গেজেটে হয়ত ভুল আছে, মার্কশিট হাতে পেলে সঠিক নম্বর জানা যাবে। আমার জীবনের এই দিনটি ছিল শ্রেষ্ঠ দিন। পরে মাধ্যমিকের রেজাল্টের ভিত্তিতে ন্যাশনাল স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। বাবার মাইনে ৫০০ টাকার বেশি ছিল বলে ন্যাশনাল স্কলারশিপ মান্থলি পাইনি, তার বদলে ন্যাশনাল প্রাইজ ১০০ টাকা ও মেরিট সার্টিফিকেট পেয়েছিলাম। সেই ১০০ টাকার চেক জমা দেবার জন্য বাগবাজার স্ট্রিটে ইউনিয়ন ব্যাংকে একটা একাউন্টও খুলতে হয়েছিল। কিন্তু ওই যেদিন গেজেট দেখে মাধ্যমিকের রেজাল্ট জেনে ছুটতে ছুটতে বাড়ি এলাম, সেদিনটা আজ ৫৩ বছর পেরিয়ে এসেও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন হিসেবে রয়ে গেছে।

My memoirs - Sessional preparation

তখন যাদবপুরে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। সেশনাল জমা দিতে হবে। আমরা যাদবপুরের ছেলেরা বি ই কলেজের মত রেসিডেন্সিয়াল হোস্টেল ফেসিলিটি, লাইট ট্রেস ইত্যাদি করার সুযোগ পাইনি। অরুনাশীষ, গাঙ্গুলি, দাম, ইত্যাদি আমরা কজন ঠিক করলাম দেবনারায়ন ওরফে জেঠুর বাড়িতে সারারাত সেশনাল বানিয়ে পরের দিন জমা দেব। জেঠু যেহেতু একেবারে গোলা মাল, ওর মেটেরিয়ালসগুলো অন্য কেউ বানিয়ে দেবে, এরকম একটা ভাবনাও ওর ছিল। কলেজ ছুটির পর ট্রেন ধরে ব্যারাকপুরে জেঠুর বাড়ি পৌঁছলাম। সেখানে খুবই আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল। সন্ধ্যেবেলা পৌঁঁছে  আমরা চলে গেলাম জয়ন্তী হলে সিনেমা দেখতে। সিনেমার নাম কাতিলো কা কাতিল। ব্ল্যাকে টিকিট কাটা হল। নাইট শো। চারিপাশে যারা বসে আছে তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে বর্ণ ক্রিমিনাল। অরুনাশীষ বলল এদের নাকি গ্রেডিং আছে। মার্ডারে দশ, রেপে পাঁচ। মোটামুটি ৪৫ নম্বর না পেলে দলে চান্স পাবে না। রিসেন্টলি এটা ৯৫ হয়েছে বলে শোনা যায়। সিনেমায় একটা করে গান হচ্ছে আর আমাদের চারপাশের ক্রিমিনালরা নাচছে আর টাকা ছুঁড়ছে। হলের লোকেরা টাকা কুড়চ্ছে এবং একই গান বার বার হচ্ছে। সিনেমা শেষ করে জেঠুর বাড়ি ফিরলাম। জেঠুর বাবা মা খুব যত্ন করে ডিনার খাওয়ালেন। তারপর শুরু হল আমাদের সেশনালের কাজ। ফিউনিকুলার পলিগন থেকে ফোর্স বার করে মেম্বার ডিজাইন। সবাই যে কাজ করছে তা নয়। দাম যেমন জেঠুর বাবার নাক ডাকার কার্ভ আঁকছিল। সারা রাত জাগা। পরের দিন কলেজে পৌঁছে সেশনাল জমা দিলাম। জেঠুর বাড়ির ওই রাত্তিরের কথা এখনো মনে আছে। ৩৪ বছর আগেকার কথা। জানিনা আর কারো মনে আছে কিনা। কবে মরে যাই, তাই লিখে রাখলাম।


Like