Saturday, March 26, 2016

My memoirs - death of Indira Gandhi

১৯৮৪ সালের ৩১সে অক্টোবর। সবে বি ই পাস করে স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার ট্রেনি হয়ে ঢুকেছি। পোস্টিং নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের সেভেন্থ ফ্লোরে প্ল্যানিং এন্ড ডিজাইন বিভাগ। অফিসের ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই শোনা গেল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর নিজেরই শিখ দেহরক্ষীদের হাতে খুন হয়েছেন। এর কিছুদিন আগেই ঘটে গেছে স্বর্ণমন্দির ambush কান্ড, যাতে খলিস্তানি শিখরা ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিল।যেহেতু তখন মোবাইল ফোন ইত্যাদি কিছুই ছিল না খবরটার সত্যতা যাচাই করা যাচ্ছে না। আমরা গিয়ে জড়ো হলাম হেয়ার স্ট্রিটে পি.টি.আই. দপ্তরের সামনে। সেখানে হাজার লোকের ভিড়। নানারকম গুজব শোনা যাচ্ছে। অবশেষে খবর মিলল। পি.টি.আই. অফিসের সামনে নোটিস লাগিয়ে দিয়ে গেল যে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজের বাসভবনে নিজেরই শিখ দেহরক্ষীর হাতে খুন হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়েই চারিদিকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হল। গাড়িঘোড়া, দোকানপাট, অফিসকাছারী সব বন্ধ হয়ে গেল। আর শোনা গেল দিকে দিকে শিখ-নিধন চলছে। শিখরা প্রাণভয়ে চুল দাড়ি কেটে ফেলছে ও বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। গাড়ি ঘোড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকলেই হেঁটে বাড়ি যাবার প্রস্তুতি নিল। রেলে করে যাঁরা অফিস আসতেন, তাঁরা রেল লাইন ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। আমার এক পরিচিত অসুস্থ মহিলা নিউ সেক্রেটারিয়েট থেকে হেঁটে শিয়ালদা-নৈহাটি রেল লাইন ধরে বেল্ঘরিয়ায় নিজের বাড়ি গিয়েছিলেন। আমরা বাসরুট ধরে হাঁটছি। পিজি হাসপাতাল পেরিয়ে হরিশ মুখার্জি স্ট্রিট ধরে যাচ্ছি। হঠাত দেখি এক জায়গায় গন্ডগোল লেগেছে। কাছে গিয়ে দেখি একটি রোগা ছেলে এক স্বাস্থ্যবান শিখ যুবককে চুলের মুঠি ধরে পিটিয়ে যাচ্ছে। শিখ যুবকটি কোন প্রতিবাদ করছে না। আশপাশের কিছু লোক মজা নিতে জড়ো হয়েছে, কেউ কেউ যোগদানও করছে। স্বাভাবিক অবস্থায় শিখ্টি ওই ছেলেটিকে এক চড় মারলে, দ্বিতীয়টি মারার জায়গা থাকবে না। শিখদের প্রপার্টিতে আগুনও দেওয়া হচ্ছিল। অনেক সেলুনে শিখদের চুল কাটতে ১০০ টাকা করেও নেওয়া হচ্ছিল। তখনকার দিনের ১০০ টাকা মানে এখনকার দিনের ১০০০ টাকার চেয়েও বেশি। হাঁটতে হাঁটতে রাসবিহারী মোড়ে এসে দেখলাম অগ্নিগর্ভ অবস্থা। রাসবিহারী মোড়ের বিখ্যাত বচ্চন সিংয়ের হোটেল ভাংচুর হয়ে বন্ধ। রাসবিহারী গুরুদ্বারের সামনে একটি গাড়ি জ্বলছে। কিছু পুলিশ গুরুদ্বার গার্ড দিতে এসেছে। গুরুদ্বারের পূর্ব দিকে রাসবিহারী এভিনিউয়ের ওপর মারমুখী জনতা পুলিসের সঙ্গে খন্ডযুদ্ধ করছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছে। শীতলা মন্দিরের কাছে পাবলিক কিছু বালতিতে জল ভরে রেখে দিয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের শেলগুলো বালতির জলে চুবিয়ে নিচ্ছে আর তুলে নিয়ে পুলিশের দিকে উল্টে ছুঁড়ে দিচ্ছে। পাবলিকের মধ্যে মেয়েরা বাচ্চারা সবাই ছিল। ব্যাপারটা কি না জেনেই হুজুগ দেখতে এসেছে। চারিদিকে একটা প্লাস্টিক পোড়া গন্ধ, চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। পুলিশ তেড়ে আসলে পাবলিক পেছিয়ে আসছে, আবার কিছুক্ষণ বাদে উল্টে তেড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ চলছে সমানে সমানে। এভাবে কিছুক্ষণ যাবার পর পুলিশ এগিয়ে এল। পাবলিকের সঙ্গে আমরা তখন শীতলা মন্দিরের গলিতে ঢুকে পড়েছি। একটা দুম শব্দের পর সামনের একটি দেওয়ালের খানিকটা প্লাস্টার খসে পড়ল। মানে এবার পুলিশ যা ছুঁড়ছে তা কাঁদানে গ্যাস নয়, গুলি। প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলাম সেদিন। রাসবিহারীর দিক দিয়ে না বেরিয়ে শা'নগরের দিক দিয়ে ঘুরে কেওড়াতলা শ্বশানের সামনে দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে এলাম। পরে শুনেছিলাম মাটালিবাগানের পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে আমারই মত হুজুগ দেখতে গিয়ে ওই দিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। সেদিন কান ঘেঁষে চলে যাওয়া গুলিটা তো আমার গায়েও লাগতে পারত। তখন কি জীবনানন্দ দাশের মত বলতে পারতাম - হয়তো গুলির শব্দ আবার / আমাদের স্তব্ধতা / আমাদের শান্তি / আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না / থাকত না আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো সাধের ব্যার্থতা ও অন্ধকার / আমি যদি বনহংস হতাম / বনহংসী হতে যদি তুমি / কোনো এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে / ধানক্ষেতের কাছে।

No comments: